শীতে শিশুর যত্ন: শীতে নবজাতক ও শিশুদের সুস্থ রাখতে প্রয়োজন সঠিক যত্ন। খাবার, পোশাক, ত্বক, ঘুম ও রোগ প্রতিরোধ নিয়ে বিস্তারিত গাইড পড়ুন।

শীতকাল শিশুদের জন্য একদিকে যেমন আনন্দের, অন্যদিকে তেমনি স্বাস্থ্যঝুঁকির সময়। এই মৌসুমে সর্দি, কাশি, নিউমোনিয়া, শ্বাসনালির সংক্রমণ, ত্বকের শুষ্কতা, পানিশূন্যতা ও ভাইরাসজনিত অসুখের প্রকোপ বেড়ে যায়। শিশুদের শরীর বড়দের তুলনায় দ্রুত তাপ হারায় এবং তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও তুলনামূলক কম। তাই শীতে শিশুর যত্নে সামান্য অবহেলাও বড় সমস্যার কারণ হতে পারে।
এই লেখায় নবজাতক, দেড় মাস থেকে এক বছর বয়সী শিশু, এক থেকে ছয় বছর বয়সী শিশু এবং স্কুলপড়ুয়া শিশু—সব বয়সভিত্তিক শীতকালীন যত্নের বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
শীতে শিশুর শরীর কেন বেশি ঝুঁকিপূর্ণ?
শিশুদের শরীর শীতের প্রতি সংবেদনশীল হওয়ার কয়েকটি কারণ—
- শরীরের চর্বির স্তর কম থাকায় তাপ দ্রুত বের হয়ে যায়
- ঘাম ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা পুরোপুরি গড়ে ওঠে না
- শীতকালে বাতাস শুষ্ক থাকায় শ্বাসনালি ও ত্বক ক্ষতিগ্রস্ত হয়
- ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া ঠান্ডা আবহাওয়ায় বেশি সক্রিয় থাকে
এই কারণেই শীতে শিশুর যত্নে বাড়তি সচেতনতা জরুরি।
নবজাতকের শীতকালীন যত্ন (জন্ম থেকে ৪০ দিন)
নবজাতক হলো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ গ্রুপ। এ সময় শিশুর শরীর নিজে থেকে তাপ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।
১. জন্মের পরপরই করণীয়
- নবজাতকের গায়ে থাকা সাদা নরম আবরণ (ভারনিক্স কেসিওসা) সঙ্গে সঙ্গে পরিষ্কার করবেন না। এটি শিশুর ত্বককে সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে এবং শরীরের উষ্ণতা ধরে রাখে।
- শিশুর মাথার চুল কেটে ফেলার কোনো প্রয়োজন নেই; এটি প্রাকৃতিকভাবে তাপ ধরে রাখতে সাহায্য করে।
২. স্কিন টু স্কিন কেয়ার (Skin-to-Skin Care)
- নবজাতককে মায়ের বুকের সঙ্গে ঘেঁষে রাখুন।
- এতে শিশুর শরীর উষ্ণ থাকে, শ্বাসপ্রশ্বাস ও হৃদস্পন্দন স্থিতিশীল হয়।
- মায়ের সঙ্গে মানসিক বন্ধনও দৃঢ় হয়।
৩. বুকের দুধের গুরুত্ব
- শীতেকালে নবজাতককে ঘন ঘন বুকের দুধ খাওয়ান।
- বুকের দুধে থাকা অ্যান্টিবডি শিশুকে সর্দি–কাশি ও সংক্রমণ সহ নানা রোগ-বালাই থেকে রক্ষা করে।
- বুকের দুধ হজম সহজ এবং শরীর উষ্ণতা ধরে রাখতে সাহায্য করে।
৪. ঘুম ও বিশ্রাম
- নবজাতকের দিনে ১৪–১৬ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন।
- পর্যাপ্ত ঘুম শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
৫. রোদ ও পরিবেশ
- প্রতিদিন সকালে ২০–৩০ মিনিট নরম রোদে রাখুন।
- ঘর বাতাস চলাচলযোগ্য রাখুন, তবে ঠান্ডা হাওয়া যেন সরাসরি না লাগে।
- ঘরে আগুন জ্বালিয়ে গরম করা বিপজ্জনক—এড়িয়ে চলুন।
৬. পোশাক ও পরিচ্ছন্নতা
- নরম তুলার পোশাক পরান।
- কানটুপি, মোজা ব্যবহার করুন।
- কুসুম গরম পানি দিয়ে শরীর মুছিয়ে পরিষ্কার রাখুন।
- ঘরের কারও সর্দি–কাশি থাকলে নবজাতকের কাছাকাছি আসতে দেবেন না।
দেড় মাস থেকে এক বছর বয়সী শিশুর শীতকালীন যত্ন
এই বয়সে শিশুর নড়াচড়া বাড়ে, ফলে পোশাক ও ত্বকের যত্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
গোসল ও ম্যাসাজ
- প্রতিদিন গোসল করানোর দরকার নেই; ২–৩ দিন পরপর যথেষ্ট।
- গোসলের আগে হালকা বেবি অয়েল দিয়ে ম্যাসাজ করলে রক্তসঞ্চালন বাড়ে।
- গোসলের পর ভালোভাবে শুকিয়ে ময়েশ্চারাইজার লাগান।
⚠️ নারকেলের তেল বা অতিরিক্ত ঠান্ডা তেল এড়িয়ে চলুন।
ডায়াপার ও ত্বকের সুরক্ষা
- ডায়াপার ব্যবহারের আগে জিঙ্ক অক্সাইডযুক্ত ক্রিম ব্যবহার করুন।
দীর্ঘ সময় ভেজা ডায়াপার রাখবেন না—এতে র্যাশ হয়। এখানে “র্যাশ (Rash)” বলতে বোঝানো হচ্ছে ত্বকে লালচে, চুলকানো বা জ্বালা করার মত চর্মরোগ বা চামড়ার জ্বালা-বিষণ্ণতা।
শিশুর ক্ষেত্রে সাধারণত ডায়াপার র্যাশ হয়ে থাকে যখন শিশুর নাজুক ত্বক দীর্ঘ সময় ভেজা বা ময়লা ডায়াপারের সংস্পর্শে থাকে। ফলে ত্বক লাল হয়ে যায়, চুলকায়, কখনো পানি বা ময়লা বের হওয়ার মতো ফোস্কাও দেখা দিতে পারে।
প্রতিরোধের উপায়:
- ডায়াপার নিয়মিত পরিবর্তন করা
- ডায়াপারের আগে জিঙ্ক অক্সাইডযুক্ত ক্রিম ব্যবহার করা
- শিশুর ত্বক শুকনো রাখা
- বেশি আঁটসাঁট ডায়াপার ব্যবহার না করা
পোশাক ব্যবস্থাপনা
- স্তরে স্তরে পোশাক পরান (Layering)।
- উল বা পশমের কাপড় ব্যবহারের আগে ভালোভাবে ধুয়ে নিন।
- হাতমোজা, পা-মোজা ও টুপি পরানোর চেষ্টা করুন।
এক থেকে ছয় বছর বয়সী শিশুর যত্ন
এই বয়সে শিশুরা দৌড়ঝাঁপ করে, তাই খুব ভারী পোশাকের দরকার হয় না।
খাবার ও পুষ্টি
- বাইরের খাবার ও ফাস্টফুড এড়িয়ে চলুন।
- শাকসবজি, ফলমূল, ডিম, দুধ, স্যুপ নিয়মিত দিন।
- ভিটামিন সি–সমৃদ্ধ খাবার (কমলা, লেবু, পেয়ারা) রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।তাই শিশুকে এই সমস্ত খাবার খাওয়ানের অভ্যাস গড়ে তুলোন।
- ঠান্ডা খাবার ও ফ্রিজের পানি সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলুন।
পোশাক ও চলাফেরা
- হালকা কিন্তু উষ্ণ পোশাক পরান।
- বেশি ঘাম হলে পোশাক বদলান—ঘাম ঠান্ডা লেগে জ্বরের কারণ হতে পারে। এই বিষয়ে সব সময় সতর্ক থাকবেন।
শীতে শিশুর ত্বকের বাড়তি যত্ন
শীতের শুষ্ক বাতাস শিশুর ত্বক ফাটিয়ে দিতে পারে।
- Soap-free ও Alcohol-free পণ্য ব্যবহার করুন।
- গোসলের পরপরই ময়েশ্চারাইজার লাগান।
- ঠোঁট ফাটা রোধে লিপ বাম ব্যবহার করুন।
- খুব গরম পানি ব্যবহার করবেন না—এতে ত্বকের প্রাকৃতিক তেল নষ্ট হয়।
মানসম্মত ঘুম ও রুটিন
- নির্দিষ্ট ঘুমানোর সময় নির্ধারণ করুন।
- স্কুলপড়ুয়া শিশুদের ৯–১২ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন।
- ঘর উষ্ণ রাখুন, তবে অতিরিক্ত গরম নয়।
শীতে সাধারণ অসুস্থতা ও ঘরোয়া করণীয়
সাধারণ লক্ষণ
- সর্দি, কাশি
- হালকা জ্বর
- ক্লান্তি
ঘরোয়া যত্ন
- গরম স্যুপ ও তরল খাবার দিন
- এক বছরের বেশি হলে মধু দিতে পারেন
- বাষ্প নিলে নাক পরিষ্কার থাকে
⚠️ জ্বর বেশি হলে বা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন।
টিকা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা
ফ্লু টিকা ও নিয়মিত টিকা সময়মতো দিন।(ফ্লু টিকা (Flu vaccine) হলো ইনফ্লুয়েঞ্জা বা ফ্লু ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক টিকা। এটি শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে, ফলে ফ্লু হলে রোগের তীব্রতা ও জটিলতা কমে।)
ফ্লু টিকার উপকারিতা:
- ফ্লু আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমায়
- জ্বর, সর্দি-কাশি ও শ্বাসকষ্টের তীব্রতা কমায়
- বয়স্ক, শিশু, গর্ভবতী নারী ও দীর্ঘমেয়াদি রোগীদের জন্য বিশেষভাবে উপকারী
কারা নেবেন:
৬ মাসের বেশি বয়সী সবাই নিতে পারেন, বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিরা।
কখন নেওয়া ভালো:
সাধারণত বছরে একবার, শীত মৌসুম শুরুর আগে নেওয়া উত্তম।
- টিকা শীতকালীন মারাত্মক সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা দেয়।
হাইড্রেশন ও পানীয়
- শীতে তৃষ্ণা কম লাগলেও পর্যাপ্ত পানি পান করান।
- গরম দুধ, স্যুপ, হালকা ভেষজ পানীয় দিতে পারেন।
স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণ
- অতিরিক্ত মোবাইল ও টিভি চোখ ও ঘুমের ক্ষতি করে।
- বই পড়া, আঁকাআঁকি, ঘরোয়া খেলায় উৎসাহ দিন।
কখন অবশ্যই ডাক্তার দেখাবেন?
- উচ্চ জ্বর
- শ্বাস নিতে কষ্ট
- খাওয়ায় অনীহা
- অতিরিক্ত দুর্বলতা বা নিস্তেজ ভাব
উপসংহার
শীতে শিশুর যত্ন মানে শুধু গরম কাপড় পরানো নয়। সঠিক খাবার, পরিচ্ছন্নতা, পর্যাপ্ত ঘুম, বুকের দুধ, সময়মতো টিকা ও সচেতনতা—এই সবকিছু মিলিয়েই একটি শিশুকে শীতকালে সুস্থ রাখা সম্ভব। বয়সভেদে সঠিক যত্ন নিলে শীতকাল শিশুর জন্য নিরাপদ ও আনন্দময় হয়ে উঠবে।